আমাশয় রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে জেনে রাখুন

জন্ডিসের লক্ষণ ও প্রতিকারসাধারণত গরমকালে আমাশয় জনিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। আমাশয় রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে আমরা অনেকেই জানি আবার অনেকেই তা জানি না। এছাড়া আমাশয় হলে কি খাবার খেতে হবে এবং কি খাবার খাওয়া যাবে না তা সম্পর্কে আমাদের সঠিক ধারণা থাকা দরকার। আজকে আমি আমার এই পোস্টে আমাশয় রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।

আমাশয় রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার

তাই আপনারা যদি আমাশয় রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পেতে চান, তাহলে অবশ্যই আমার এই পোস্টটি মনোযোগ সহকারে পড়ুন। আমি আশা করছি যে, এই পোস্টটি পড়লে আপনারা আমাশয় সম্পর্কে অনেক তথ্য জানতে পারবেন।

পোস্ট সূচিপত্রঃআমাশয় রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে জেনে রাখুন

ভূমিকা

আমাশয় একটি পেটের অসুখ যা হলে অনবরত শ্লেষ্মাযুক্ত পাতলা পায়খানা হতে থাকে। অনেক সময় অতিরিক্ত আমাশয়ের কারণে মানুষের মরণাপন্ন অবস্থা হয়ে থাকে। এজন্য আমাশয়কে কখনোই হালকা ভাবে নেওয়া উচিত নয়। এটি হলে দ্রুত এর ট্রিটমেন্ট শুরু করে দেয়া উচিত। আমাশয় রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে আমাদের অবশ্যই ধারণা থাকতে হবে। তাহলে আমরা আমাশয়ের দ্রুত চিকিৎসা শুরু করতে পারব।

আমাশয় রোগ কি

আমাশয় অন্ত্রের প্রদাহ দ্বারা চিহ্নিত গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল ব্যাধিকে বোঝায়। আমাশয় মানবতন্ত্রে রোগ-জীবাণু সংক্রমণজনিত রোগ যা এন্টামিবা হিস্টোলাইটিকা ব্যাকটেরিয়া মানবদেহের পরিপাকতন্ত্রে আক্রমণ করলে এই রোগ হয়ে থাকে। এর ফলে প্রদাহের সৃষ্টি হয়, পেটব্যথা করে, ও রক্তসহ পাতলা পায়খানা হয়ে থাকে।

আরও পড়ুনঃ ডায়রিয়া হলে কি খাওয়া উচিত

আমাশয় পরজীবী বা ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে সৃষ্টি হয়ে থাকে। এই রোগটি খুব মারাত্মক ও অনেক কষ্টদায়ক। তাই আমাশয় রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার গুলো জেনে রাখা আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরী।

আমাশয়ের রোগের কারণ

আমাশয় ছোট বড় সকলেরই প্রায়ই সময় হয়ে থাকে। এটি একটি পানিবাহিত রোগ যা নানা কারণে হয়ে থাকে। আমাশয় রোগের কারণ গুলো নিচে তুলে ধরা হলো।

  • আমাশয় ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা প্রোটোজোয়া জীবাণুর সংক্রমণের কারণে হয়ে থাকে।
  • দূষিত পানি পান করা ও ব্যবহারের মাধ্যমে আমাশয় হয়।
  • বাশি-পঁচা খাবার খেলে আমাশয় হয়ে থাকে।
  • অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করলে আমাশয় হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
  • অতিরিক্ত গরমের কারণেও আমাশয় হতে পারে।
  • খাবার হজমের সমস্যা হলে তা থেকে আমাশয়ের সংক্রমণ হয়ে থাকে।
  • ফাস্টফুড ও তেলে ভাজা খাবার অতিরিক্ত খেলে আমাশয় হয়ে থাকে।
  • পরিবারের একজনের আমাশয় হলে তা সংক্রমিত হয়ে অন্য সদস্যদেরও হতে পারে।
  • অনেক সময় অতিরিক্ত গ্যাসের কারণেও আমাশয় হয়ে থাকে।
  • আলসারের সমস্যা থাকলে ঘন ঘন আমাশয় হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
  • পরিপাকতন্ত্রে ক্যান্সার থাকলে আমাশয় সমস্যা দেখা দিতে পারে।
  • শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে ঘন ঘন আমাশয় দেখা দেয়।
  • অনেক সময় অতিরিক্ত ঔষধ সেবনের কারণেও আমাশয় হয়ে থাকে।
  • যাদের ডায়াবেটিস রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে আমাশয় ঘন ঘন দেখা দেয়।

আমাশয় রোগের লক্ষণ

আমাশয় রোগের কিছু লক্ষণ বা উপসর্গ রয়েছে, যা দেখলে আমরা বুঝতে পারবো যে আমাশয় হয়েছে। নিচে আমাশয় রোগের লক্ষণ বা উপসর্গ গুলো তুলে ধরা হলো।

  • আমাশয় হলে শ্লেষ্মাযুক্ত রক্ত পায়খানা শুরু হয়ে যায়।
  • আমাশয় হলে পেট প্রচন্ড ব্যথা করে।
  • বমি বমি ভাব বা ঘন ঘন বমি হয়।
  • পেট প্রচন্ড ফেঁপে থাকে।
  • মল প্রচন্ড দুর্গন্ধযুক্ত হয়।
  • অতিরিক্ত আমাশয় হলে হাত-পায়ের রগ প্রচন্ড টেনে ধরে।
  • অতিরিক্ত মলত্যাগের কারণে প্রচন্ড মাথা ঘুরতে থাকে।
  • ঘন ঘন মুখ শুকিয়ে যায় এবং পিপাসা লাগে।
  • শরীরের জ্বর চলে আসে এবং প্রচন্ড ঠান্ডা লাগা শুরু হয়।
  • শরীরের হার্টবিট একেবারে কমে যায়।
  • আমাশয় হলে শরীর পানি শূন্য হয়ে পড়ে।
  • প্রস্রাব হ্রাস পায় এবং প্রসাব গাঢ় বর্ণবিশিষ্ট হয়ে যায়।
  • গোটা শরীরে প্রচন্ড কাঁপুনি শুরু হয়ে যায়।
  • শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে এবং অস্বাভাবিক ওজন হ্রাস পায়।
  • শরীরের পেশী বা জয়েন্টগুলোতে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভূতি হয়।
  • অতিরিক্ত আমাশয় হলে অনেক সময় ত্বক কালো হয়ে যেতে পারে।

আমাশয় হলে কি খাবার খেতে হবে

এমন কিছু খাবার রয়েছে যে খাবারগুলো আমাশয় হলে খাওয়া উচিত। আমাশয় হলে এ খাবারগুলো খেলে আমাশয় এর প্রভাব কিছুটা কমে আসে। আমাশয় হলে কি খাবার খাওয়া উচিত তার সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হল।

  • আমাশয় হলে সর্বপ্রথম স্যালাইন পানি বেশি বেশি খেতে হবে। এতে করে শরীরে যে পানি শূন্যতা তৈরি হয় তা পূরণ করে স্যালাইন পানি।
  • আমাশয় ভালো করতে কাঁচা ও পাকা কলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কলাতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে আইরন যা পাতলা পায়খানা কে শক্ত করতে সাহায্য করে। এছাড়া কলা খুব সহজেই হজম হয়।
  • আমাশয় হলে মারি ভাত বা নরম খিচুড়ি বেশি বেশি খেতে হবে। এতে করে সহজেই খাবার হজম হবে এবং শরীরের পানি অভাবেও পূরণ হবে।
  • আমাশয় হলে স্যালাইন পানির পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ফলের রসও খাওয়া উচিত। এতে করে শরীরে পানি শূন্যতা দূর হবে।
  • এ সময় শরীরের পানিশূন্যতা তৈরি হয় যা দূর করা অত্যন্ত প্রয়োজন, এজন্য এ সময় ডাবের পানি পান করা ভালো। এতে করে পানি শূন্যতা দূর হবে এবং পুষ্টিগুনোও পাওয়া যাবে।
  • আলুতে ইলেক্ট্রোলাইট পটাশিয়াম বেশি থাকে যা সহজে হজম হয়। এই সময় আলু সিদ্ধ করে সামান্য লবণ ও গোলমরিচের গুঁড়ো দিয়ে ভর্তা করে খেলে আমাশয় অনেকটাই কমে যায়।
  • আমাশয় হলে নরম ভাতের সাথে হালকা মসলাযুক্ত ঝোলের তরকারি খাওয়া উচিত। এতে করে খাবার সহজেই হজম হবে এবং শরীরের শক্তি যোগাবে।
  • এ সময় লেবু ও আখের গুড়ের মিশ্রিত শরবত বেশি বেশি করে পান করতে হবে। এতে করে শরীরের পানির অভাব অনেকটাই দূর হয়ে যাবে এবং শরীরে এনার্জি তৈরি হবে।
  • আমাশয় হলে চিড়া ভিজিয়ে নরম করে তার সাথে সামান্য লবণ ও চিনি মিশিয়ে খাওয়া খুব উপকার।
  • আমাশয় হলে দই খাওয়া যেতে পারে। দইয়ের মধ্যে ভালো ব্যাকটেরিয়া থাকে যা আমাশয় রোধ করতে সাহায্য করে। এছাড়া দইয়ের মধ্যে থাকা প্রোবায়োটিকস পেট ঠান্ডা রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

আমাশয় হলে কি খাবার খাওয়া যাবে না

আমাশয় হলে যেমন কিছু খাবার খাওয়া জরুরী তেমনি এমন কিছু খাবার রয়েছে যেগুলো খাওয়া উচিত নয়। আমাশয় হলে কি খাবার খাওয়া যাবে না তা সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হলো।

  • আমাশয় হলে দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার একেবারেই খাওয়া উচিত নয়। দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার সহজে হজম হয় না যার ফলে আমাশয় সমস্যাকে আরো বাড়িয়ে তোলে।
  • আমাশয় হলে চা বা কফি এ ধরনের ক্যাফেন জাতীয় খাবার একেবারে খাওয়া উচিত নয়। এ সময় চা বা কফি পেটের জ্বালা আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে।
  • আমাশয় হলে ঝাল ও তৈলাক্ত খাবার একদমই খাওয়া উচিত নয়। ঝাল ও তেল গ্যাসের সৃষ্টি করে আমাশয় হওয়াকে আরো বাড়িয়ে তোলে।
  • আমাশয় হলে কোমল পানীয় ও চিনিযুক্ত কোন খাবার খাওয়া উচিত নয়।
  • আমাশয় হলে অ্যালকোহল জাতীয় খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। কারণ অ্যালকোহল স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর।
  • আমাশয় হলে ডিম না খাওয়াই ভালো। ডিম সহজে হজম হতে চায় না এজন্য এ সময় ডিম না খাওয়াই উচিত।
  • এ সময় প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাবার, জর্দা, তামাক, সিগারেট ইত্যাদি খাবার পরিত্যাগ করতে হবে।
  • আমাশয় হলে ফাইবারযুক্ত খাবার খাওয়া উচিত নয়। কারণ ফাইবারযুক্ত খাবার আপনার আমাশয়কে আরো বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করবে। যেমন- শাকসবজি, গরু বা খাসির মাংস, মটরশুটি, সিম, বাদাম, পেয়ারা, আটার রুটি ইত্যাদি।
  • এ সময় কাঁচা রসুন, কাঁচা পেঁয়াজ, শসা, মুলা ইত্যাদি খাবার খাওয়া উচিত নয়।

আমাশয় রোগের প্রতিকার

আমাশয় একটি খুবই খারাপ রোগ যা হলে একজন মানুষ খুব সহজেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। এজন্য আমাশয় হলে তা থেকে প্রতিকারের উপায় গুলো দ্রুত গ্রহণ করতে হবে। আমাশয় রোগের প্রতিকারের উপায় গুলো সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হল।

  • আমাশয় পানিবাহিত জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হয়, এজন্য নিরাপদ পানির ব্যবস্থা দ্রুত করতে হবে।
  • আমাশয় হলে ঠান্ডা বা বাশি খাবার গরম করে একদমই খাওয়া যাবে না।
  • খাবার সব সময় ঢেকে রাখা উচিত যেন খাবারে পোকা-মাকড়, মাছি ও ধুলাবালি না পড়ে।
  • মলত্যাগের পর ও খাওয়ার পূর্বে অবশ্যই সাবান দিয়ে ভালো করে হাত ধুয়ে নিতে হবে।
  • খাবার তৈরির পূর্বে ও খাবার পরিবেশনের আগে অবশ্যই হাত ও থালা-বাসন ভালো হবে পরিষ্কার করে নিতে হবে।
  • আমাশয় আক্রান্ত রোগীর ব্যবহারকৃত কাপড়চোপড় অবশ্যই আলাদা রাখতে হবে এবং প্রতিদিন সাবান পানি দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে।
  • আমাশয় আক্রান্ত রোগীকে কখনোই ঠান্ডা খাবার খাওয়ানো উচিত নয়। এ সময় গরম গরম খাবার খাওয়ানো উচিত।
  • আমাশয় হলে রোগীকে আলো ও বাতাস সমৃদ্ধ জায়গায় রাখতে হবে এবং চারপাশে নিরিবিলি পরিবেশ বজায় রাখতে হবে।
  • আমাশয় হলে রোগীর শরীর অনেক ক্লান্ত হয়ে যায়, এজন্য অবশ্যই রোগীকে ঘুমের ব্যবস্থা করে দিতে হবে।
  • শিশুদের ক্ষেত্রে যারা বুকের দুধ পান করে সেসব শিশুদের এ সময় বেশি বেশি বুকের দুধ খাওয়াতে হবে।

    আমাশয় রোগের ঔষধ

    আমাশয় হলে ঘরোয়া উপায়গুলো প্রয়োগ করার পরেও যদি আমাশয় না কমে, তাহলে আমাশয় বন্ধ করার ঔষধ খাওয়াতে হবে। আমাশয় বন্ধ করার বেশ কিছু ঔষধ রয়েছে, যা খেলে দ্রুত আমাশয় বন্ধ হয়ে যাবে। আমাশয় রোগের ঔষধগুলো হলো- 

    • Filmet- 400mg Tablet
    • Amezol- 400mg Tablet
    • Amirid- 400mg Tablet
    • Amobin- 400mg Tablet
    • Amodis- 400mg Tablet
    • Amogit- 400mg Tablet
    • Amotrex- 400mg Tablet
    • Anamet- 400mg Tablet
    • Antipro- 400mg Tablet
    • Benmet- 400mg Tablet
    • Biozyl- 400mg Tablet
    • Dirozyl- 400mg Tablet
    • Flamyd- 400mg Tablet
    • Metco- 400mg Tablet
    • Metonid- 400mg Tablet
    • Metrion- 400mg Tablet
    • Metsina- 400mg Tablet
    • Mez- 400mg Tablet

    বিঃদ্রঃ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোন ধরনের ঔষধ খাবেন না।

    শেষ কথা

    আমরা উপরের আলোচনা থেকে আমাশয় রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে অনেক তথ্য জানতে পারলাম। আমাশয় হলে দ্রুত তার চিকিৎসা শুরু করে দিতে হবে অথবা অতিরিক্ত বেশি হলে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। দ্রুত চিকিৎসা শুরু করার মাধ্যমে আমাশয় রোগের প্রতিকার করা সম্ভব। 

    পরিশেষে আমি এটাই বলতে চাই যে, আমার এই পোস্টটি আপনাদের পড়ে ভালো লেগে থাকলে অবশ্যই শেয়ার করে দিবেন এবং সাথেই থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে।

    এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

    পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
    এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
    মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

    AN Heaven এর নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

    comment url