থ্যালাসেমিয়া রোগের লক্ষণ ও প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে জেনে রাখা উচিত

হার্টের সমস্যার লক্ষণ ও প্রতিকারপ্রিয় পাঠক, আপনারা অনেকেই থ্যালাসেমিয়া রোগের লক্ষণ ও প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে জানতে আগ্রহী। এজন্য আজকে আমি আপনাদের সামনে থ্যালাসেমিয়া রোগের লক্ষণ ও প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে আলোচনা করব। থ্যালাসেমিয়া এমন একটি অসুখ যেটি হলে একজন মানুষ রক্তশূন্যতায় ভোগে। অর্থাৎ থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগীর শরীরে রক্ত তৈরি হয় না বরং নিয়মিত তাদের শরীরে রক্ত প্রদান করতে হয়। থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগীর বিশেষ কিছু যত্নের প্রয়োজন হয়। থ্যালাসেমিয়া রোগীর খাবার তালিকা অন্যদের চাইতে আলাদা হয়ে থাকে। আমি আমার এই আর্টিকেলে থ্যালাসেমিয়া রোগের লক্ষণ ও প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আলোচনা করব।

থ্যালাসেমিয়া রোগের লক্ষণ ও প্রতিরোধ

তাই আপনারা যদি থ্যালাসেমিয়া রোগের লক্ষণ ও প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চান তাহলে আমার এই আর্টিকেলটি মনোযোগ সহকারে পড়ুন। আমি আশা করছি যে, এ আর্টিকেলটি পড়লে আপনারা অনেক কিছু জানতে পারবেন।

পোস্ট সূচিপত্রঃথ্যালাসেমিয়া রোগের লক্ষণ ও প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে জেনে রাখা উচিত

ভূমিকা

কমবেশি আমরা সকলেই থ্যালাসেমিয়া রোগের লক্ষণ ও প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে অবগত রয়েছি। এটি একটি এমন রোগ যা বংশগতভাবে হয়ে থাকে। বাবা-মা যদি এই রোগের বাহক হন তাহলে সন্তানও এ রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। থ্যালাসেমিয়া একটি মারাত্মক ও বিরল রোগ যা হলে মানুষের গড় আয়ু অনেক কমে যায়। এজন্য আমাদের থ্যালাসেমিয়া কি, থ্যালাসেমিয়া কেন হয়, থ্যালাসেমিয়া রোগের লক্ষণ ও প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জেনে রাখতে হবে। তাহলে আমরা এই রোগ সম্পর্কে জ্ঞান রাখতে পারবো এবং এ রোগের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবো।

থ্যালাসেমিয়া কি

থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত বা জেনেটিক রোগ যা হলে শরীরের হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কমে যায় এবং রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। একজন মানুষের রক্তের গড় আয়ু ১২০ দিন কিন্তু যাদের এই সমস্যাটি রয়েছে তাদের রক্তের গড় আয়ু অনেক কম হয়। আর থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত রোগীর শরীরে রক্ত তৈরি হয় না। এজন্য একটি নির্দিষ্ট টাইমের পরপর রক্ত শরীরে দেওয়া লাগে। এ রোগের কারণে শরীরে লোহিত রক্তকণিকা তৈরি হয় না আর যেগুলো তৈরি হয় সেগুলো কিছুক্ষণ সময়ের জন্য থাকে। যার জন্য অতিরিক্ত রক্ত শরীরের প্রদান করার প্রয়োজন পড়ে। এই থ্যালাসেমিয়া সমস্যা শিশুকাল থেকেই পরিলক্ষিত হয়ে থাকে।

আরও পড়ুনঃ রক্তে হিমোগ্লোবিন কমে যাওয়ার কারণ ও করণীয় 

থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগীদের গড় আয়ু অনেক কম হয় অর্থাৎ তারা বেশি দিন বেঁচে থাকে না। এটি একটি অতি মারাত্মক অসুখ যার কোন সঠিক চিকিৎসা এখনো বের হয়নি। থ্যালাসেমিয়া সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে যথা- আলফা থ্যালাসেমিয়া ও বিটা থ্যালাসেমিয়া। চারটি জিনের সমন্বয়ে মানুষের শরীর গঠন হয়। এই চারটি জিনের মধ্যে যদি দুইটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হয় তাহলে রক্তে বিটা থ্যালাসেমিয়া তৈরি হয়। আর যদি চারটি জিনই ত্রুটিপূর্ণ হয় তাহলে আলফা থ্যালাসেমিয়া হয়ে থাকে।

থ্যালাসেমিয়া কেন হয়

থ্যালাসেমিয়া হওয়ার বেশ কিছু কারণ রয়েছে। থ্যালাসেমিয়া কেন হয় সে বিষয়ে নিচে আলোচনা করো।

  • সাধারণত ত্রুটিপূর্ণ হিমোগ্লোবিন জিনের কারণে থ্যালাসেমিয়া হয়ে থাকে।
  • বাবা ও মা এর থ্যালাসেমিয়ার সমস্যা থাকলে জেনেটিক বা বংশগত ভাবে সন্তানের মধ্যে এটি ছড়িয়ে পড়ে।
  • একটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে হিমোগ্লোবিনে অতি কম মাত্রায় থ্যালাসেমিয়া হয়ে থাকে।
  • দুইটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে হিমোগ্লোবিনে থ্যালাসেমিয়া হালকা মাত্রায় হয়ে থাকে।
  • তিনটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে হিমোগ্লোবিনে থ্যালাসেমিয়া মাঝারি মারাত্মক আকার ধারণ করে থাকে।
  • চারটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে হিমোগ্লোবিনে অতি মারাত্মক আকার ধারণ করে, যা আলফা থ্যালাসেমিয়া নামে পরিচিত।

থ্যালাসেমিয়ার লক্ষণ

থ্যালাসেমিয়া হলে মানুষের শরীরে নানা ধরনের লক্ষণ বা উপসর্গ দেখা দেয়। নিচে থ্যালাসেমিয়ার লক্ষণগুলো তুলে ধরা হলো।

  • থ্যালাসেমিয়া রোগের প্রথম লক্ষণ হল শরীরে রক্তশূন্যতা তৈরি হওয়া।
  • থ্যালাসেমিয়া হলে মানুষের শারীরিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়।
  • এ রোগ হলে বয়সের তুলনায় উচ্চতা অনেক কম হয়।
  • এ রোগ হলে যেহেতু রক্তশূন্যতা হয় সেহেতু শরীর ফ্যাকাসে হয়ে যায়।
  • শরীর অনেক দুর্বল হয়ে যায় এবং ক্লান্তি অনুভূতি হয়।
  • থ্যালাসেমিয়া হলে খাবারের প্রতি অরুচি তৈরি হয় এবং খিদে হারিয়ে যায়।
  • এর রোগ হলে তলপেট প্রচন্ডভাবে ফুলে যায়।
  • থ্যালাসেমিয়ার কারণে হৃদপিন্ডের সমস্যা তৈরি হয়।
  • এ রোগ হলে মাথা ব্যথা করে ও মাথা ঘোরা শুরু হয়।
  • রক্তশূন্যতার কারনে সব সময় শরীরের মধ্যে অস্থিরতা কাজ করে।
  • এ সমস্যা হলে প্রস্রাব গারো রঙের হতে পারে।
  • থ্যালাসেমিয়ার কারণে শরীরে জন্ডিসের প্রভাব পড়তে পারে।
  • শ্বাসকষ্ট শুরু হয় এবং নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়।
  • শরীরের আকার আকৃতি বিকৃত হওয়া শুরু হয়।

শিশুর থ্যালাসেমিয়া রোগের লক্ষণ

শিশুদের ক্ষেত্রে থ্যালাসেমিয়ার রোগের লক্ষণ গুলো প্রায় একই রকমই। নিচে শিশুর থ্যালাসেমিয়া রোগের লক্ষণগুলো তুলে ধরা হলো। 

  • শিশুর থ্যালাসেমিয়া রোগ হলে শারীরিক বৃদ্ধি হ্রাস পায়।
  • শিশুর শরীরে সঠিকভাবে রক্ত তৈরি হয় না, যার ফলে রক্তশূন্যতা দেখা দেয়।
  • এ সমস্যা হলে শিশুর পেট প্রচন্ড ফুলে যায়।
  • এ রোগে আক্রান্ত বাচ্চারা দেখতে অন্য সব সাধারণ বাচ্চাদের থেকে কিছুটা আলাদা দেখায়।
  • এ রোগে আক্রান্ত বাচ্চারা শারীরিকভাবে অনেক দুর্বল প্রকৃতির হয়ে থাকে।
  • থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত বাচ্চারা অনেক দেরি করে বসতে শেখে, হাঁটতে শেখে ও কথা বলতে শেখে।
  • এই রোগে আক্রান্ত শিশুর শ্বাসকষ্টের সমস্যা বেশি পরিলক্ষিত হয়।
  • এ রোগে আক্রান্ত শিশুদের কপাল সামনের দিকে বৃদ্ধি পায়, চোয়াল বেড়ে যায় ও উপরের পার্টির দাঁত বের হয়ে আসে।
  • এ রোগে আক্রান্ত শিশুদের সব সময় খিটখিটে মেজাজ হয়ে থাকে।
  • শিশুদের খাবার প্রতি অনিহা তৈরি হয় এবং সহজে কোন খাবার খেতে চায় না।
  • এ রোগে আক্রান্ত শিশুদের লিভার অনেক সময় বড় হয়ে যায়।

থ্যালাসেমিয়া রোগীর খাবার তালিকা

থ্যালাসেমিয়া রোগীর খাবারের তালিকা অন্য সবার চাইতে কিছুটা আলাদা হয়ে থাকে। যেহেতু থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগীর রক্ত তৈরি হতে পারে না সেহেতু এ ধরনের রোগের প্রতি অধিক যত্নশীল হতে হয়। নিচে থ্যালাসেমিয়া রোগীর খাবার তালিকা তুলে ধরা হলো।

  • থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগীকে কম পরিমাণে আয়রনযুক্ত খাবার খেতে দিতে হবে।
  • প্রচুর পরিমাণে সবুজ শাকসবজি প্রতিদিন খাবার তালিকায় রাখতে হবে।
  • টাটকা ফলমূল প্রচুর পরিমাণে খাদ্য তালিকায় রাখা উচিত।
  • ফাইবারযুক্ত খাবার থ্যালাসেমিয়া রোগীর খাবার তালিকায় রাখতে হবে।
  • দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার নিয়মিত খেতে দিতে হবে।
  • বেশি বেশি পানি ও পানি জাতীয় খাবার খেতে হবে।
  • থ্যালাসেমিয়া রোগীদের প্রতিদিন ১ কাপ করে চা বা কফি খাওয়া উচিত।
  • গরুর মাংস, কলিজা, ডিম ইত্যাদি থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য নিষিদ্ধ।
  • ভিটামিন ও ক্যালসিয়াম যুক্ত খাবার থ্যালাসেমিয়া রোগীদের বেশি বেশি খাওয়াতে হবে।
  • এ রোগে আক্রান্ত রোগীকে বেশি বেশি ছোট মাছ খেতে হবে।

থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে করণীয়

থ্যালাসেমিয়া রোগ প্রতিরোধে আমাদের কিছু করণীয় পদক্ষেপ রয়েছে। সেই পদক্ষেপগুলো গ্রহণের মাধ্যমে আমরা থ্যালাসেমিয়া রোগ প্রতিরোধ করতে পারব। নিচে থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

  • বিয়ের আগে অবশ্যই ছেলে-মেয়ে দুজনেরই রক্ত পরীক্ষা করে দেখতে হবে তারা থ্যালাসেমিয়ার বাহক কি না।
  • থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত দুই বাহকের মধ্যে বিয়ে দেওয়া যাবে না।
  • একজন বাহক যদি আরেকজন বাহককে বিয়ে না করে তবে থ্যালাসিমিয়া আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমতে থাকবে।
  • স্বামী-স্ত্রী দুজনে যদি থ্যালাসেমিয়া বাহক হয় তাহলে সন্তান নেওয়ার পূর্বে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী সন্তান নিতে হবে।
  • যদি একজন বাহকের সাথে একজন সুস্থ মানুষের বিয়ে হয় তবে সন্তানের থ্যালাসিমিয়ার বাহক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।
  • গর্ভের সন্তান থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত কিনা তা জানার জন্য ৮-১৪ সপ্তাহের মধ্যে অ্যামনিওসেনটেসিস, ফিটাল ব্লাড সিম্পলিং,কোরিওনক ভিলাস স্যাম্পলিং ইত্যাদি এর মাধ্যমে গর্ভের সন্তানের কাউন্সিলিং করাতে হবে।
  • আত্মীয়র মধ্যে বিয়ে হলে অর্থাৎ খালাতো, মামাতো, চাচাতো, ফুফাতো ভাই-বোনের মধ্যে বিয়ে হলে তাদের সন্তানের থ্যালাসেমিয়া রোগ হতে পারে। এজন্য আত্মীয়র মধ্যে অর্থাৎ রক্তের সম্পর্ক রয়েছে এমন ছেলে-মেয়ের সাথে বিয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
  • থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধের জন্য সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রতিবছর ৮ মে 'বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস' পালন করা হয়।

শেষ কথা

উপরের আলোচনা থেকে আমরা সকলেই থ্যালাসেমিয়া রোগের লক্ষণ ও প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে অনেক তথ্য জানতে পারলাম। থ্যালাসেমিয়া একটি জেনেটিক্যাল রোগ যা বাবা-মা দুজনার থাকলে সন্তানেরও হয়ে থাকে। তাই এ ধরনের সমস্যা হলে অবশ্যই ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করতে হবে।

পরিশেষে আমি এটাই বলব যে, আমার এই পোস্ট আপনাদের ভালো লেগে থাকে তাহলে অবশ্যই শেয়ার করে দিবেন এবং সাথেই থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

AN Heaven এর নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url