ভাইরাস জ্বরের লক্ষণ ও প্রতিকার করার উপায় সমূহ জেনে রাখুন

বাচ্চাদের সর্দি হলে কি খাওয়া উচিতবর্তমান সময়ে ভাইরাস জ্বর প্রকোপ আকার ধারণ করছে। নানা ধরনের প্রাকৃতিক ভারসাম্যহীনতার কারণে ভাইরাসের সৃষ্টি হয়ে এ ধরনের জ্বর হয়ে থাকে। এজন্য আমাদের ভাইরাস জ্বরের লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে অবগত থাকতে হবে। যেন আমাদের এ ধরনের অসুখ হলে দ্রুত তা চিহ্নিত করে এর প্রতিকার গড়ে তুলতে পারি। এছাড়া শিশুরাই এ জ্বরে অনেক বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে। তাই আজ আমি আমার এই পোস্টে শিশুর ভাইরাস জ্বরের লক্ষণ ও প্রতিকার করার উপায় সম্পর্কে আলোচনা করব।

ভাইরাস জ্বরের লক্ষণ ও প্রতিকার

আপনারা যদি ভাইরাস জ্বর সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চান, তাহলে আমার এই পোস্টটি মনোযোগ সহকারে পড়ুন। আপনার এই পোস্ট থেকে ভাইরাস জ্বরের লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে অনেক তথ্য পেয়ে যাবেন।

পোস্ট সূচিপত্রঃভাইরাস জ্বরের লক্ষণ ও প্রতিকার করার উপায় জেনে রাখুন

ভূমিকা

শিশু থেকে বৃদ্ধ সকল বয়সের মানুষের জ্বর হতে পারে। তবে শিশু ও বৃদ্ধরাই জ্বরে বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে। অনেক সময় সাধারণ জ্বর ভাইরাস জ্বরে পরিণত হতে পারে। ভাইরাস জ্বর সহজে ভাল হতে চায় না, এটির স্থায়িত্বও অনেক দিন হয়ে থাকে। দিন দিন ভাইরাস জ্বরের প্রকোপ বেড়েই চলেছে। তাই ভাইরাস জ্বরের লক্ষণ ও প্রতিকার করার উপায় সম্পর্কে এই পোস্টে আলোচনা করা হয়েছে।

ভাইরাস জ্বর কি

আমরা প্রত্যেকেই নানার সময়ে জ্বরে ভুগে থাকি। সাধারণত আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে জ্বর হয়ে থাকে। অনেকে আবার স্বাভাবিক ভাবে প্রতি বছরই জ্বরে ভুগে থাকেন। আবার যেকোনো রোগের কারণে মানুষের জ্বর হতে পারে। ঋতুর পরিবর্তন ও আবহাওয়ার আদ্রতার কারণে যে জ্বর হয়ে থাকে সেটি সাধারণ জ্বর হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে ওষুধ খাওয়ার তেমন একটা বেশি প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু ভাইরাস জনিত জ্বর হলে এটি সাধারন ওষুধে ভালো হতে চায় না। এটি একটি ছোঁয়াচে জ্বর যা একজনের থেকে অন্য জনের মধ্যে সংক্রমিত হয়ে থাকে। এরফলে পরিবারের একজন জ্বরে আক্রান্ত হলে পরবর্তীতে সকল সদস্যই এই ভাইরাস জ্বরে আক্রান্ত হয়।

আরও পডুনঃ টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ ও প্রতিকার

ভাইরাসজনিত জ্বরের জন্য ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ এ, বি ও সি ভাইরাস দায়ী। এ ভাইরাসের আক্রমণের কারণে ভাইরাস জ্বর হয়ে থাকে। ভাইরাস জ্বর হলে সহজে ভাল হতে চায় না। প্রায় দুই সপ্তাহ সময় লাগে এটি ভালো হতে। অনেকের ক্ষেত্রে ভালো হতে এর চেয়েও অধিক সময় লাগতে পারে। আপনার জ্বর যদি এক সপ্তাহের বেশি হয়ে যায় তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

ভাইরাস জ্বরের কারণ

ভাইরাস জ্বর হওয়ার অনেক গুলো কারণ রয়েছে। নিচে ভাইরাস জ্বরের কারণ গুলো তুলে ধরা হলো।

  • করোনা ভাইরাসের কারণে বড়দের ও শিশুদের ভাইরাসজনিত জ্বর হয়ে থাকে।
  • ডেঙ্গুর কারণে যে জ্বর হয় তা ভাইরাস জ্বর হিসেবে পরিচিত।
  • টাইফয়েড বা ম্যালেরিয়ার কারণে সাধারণত ভাইরাস জ্বর হয়ে থাকে।
  • প্রসবের রাস্তায় ইনফেকশন হলে ভাইরাস জ্বর হতে পারে।
  • অনেক সময় কোন ধরনের টিকা নিলে বড়দের ও শিশুদের এই জ্বর হতে পারে।
  • রিউমাটয়েড আর্থাইটিস হলে ভাইরাসজনিত জ্বর হতে পারে।
  • অপুষ্টিকর খাবার খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। যার ফলে সহজে ভাইরাস জনিত জ্বর হয়ে থাকে।
  • শরীরের ভিতরে কোন ধরনের ভাইরাস ঢুকলে, সাধারণত ভাইরাসজনিত জ্বর হয়ে থাকে।
  • ক্যান্সারের সমস্যা থাকলে খুব সহজেই ভাইরাস জ্বরে রোগী আক্রান্ত হতে পারে।
  • অস্বাস্থ্যকর খাবার খেলে এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকলেও ভাইরাসজনিত জ্বর সহজেই আক্রমণ করে।

ভাইরাস জ্বরের লক্ষণ

ভাইরাসজনিত জ্বরের অনেকগুলো লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। যা দেখে আমরা সহজে বুঝতে পারবো যে রোগীর ভাইরাসজনিত জ্বর হয়েছে। নিচে ভাইরাস জ্বরের লক্ষণগুলো তুলে ধরা হলো।

  • ভাইরাসজনিত জ্বর হলে এর প্রথম লক্ষণ হলো জ্বর ১০০ ডিগ্রী পার হয়ে যাবে। যেমন-১০২ ডিগ্রী, ১০৩ ডিগ্রী ও ১০৪ ডিগ্রী পর্যন্ত জ্বর উঠতে পারে।
  • ভাইরাস জ্বর হলে প্রচন্ড মাথা ব্যথা হয়ে থাকে। যা খুবই যন্ত্রণাদায়ক পর্যায়ে চলে যায়।
  • এ জ্বর হলে শরীরের মাংসপেশি ও গিরায় গিরায় প্রচন্ড ব্যথা করে।
  • ভাইরাস জ্বর হলে প্রচন্ড কাশি ও গলায় অনেক ব্যথা শুরু হয়ে যায়।
  • এ জ্বর হলে নাক দিয়ে ও চোখ দিয়ে পানি ঝরতে থাকে।
  • এ জ্বরের কারণে চোখ প্রচন্ড লাল হয়ে যায় ও চোখ চুলকাতে থাকে।
  • ভাইরাস জ্বর হলে সব সময় বমি বমি ভাব হয় ও খাওয়ারে অরুচি হতে লাগে।
  • এ জ্বরের কারণে অনেক সময় শরীরে খিচুনি দেখা দেয়।
  • শরীরের চামড়ায় ও মুখের ত্বকে এলার্জি দেখা দেয়।
  • প্রচন্ড মাথা ঘুরতে থাকে এবং শরীর দুর্বল হয়ে যায়।
  • প্যারাসিটামল খেলেও জ্বর একদমই কমতে চায় না।

ভাইরাস জ্বরের প্রতিকার

ভাইরাস জ্বর একটি খুবই খারাপ ধরনের জ্বর যা হলে সহজে ভালো হতে চায় না। ভাইরাস জ্বর হলে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ খাওয়ার আগে কিছু ঘরোয়া ট্রিটমেন্ট রয়েছে যেগুলো নেওয়া অতি জরুরী। ভাইরাস জ্বরের প্রতিকার হিসেবে এ ঘরোয়া ট্রিটমেন্ট গুলো আমরা এপ্লাই করতে পারি। নিচে ভাইরাস জ্বরের প্রতিকার সমূহ আলোচনা করা হলো।

  • জ্বর হলে অবশ্যই রোগীর শরীরের তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। তাপমাত্রা যদি ১০০ ডিগ্রীর উপরে চলে যায় তাহলে তা কমানোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
  • তাপমাত্রা বেশি হলে কপালে জলপট্টি দিতে হবে। গামছা বা তোলাতে পানিতে ভিজিয়ে বারে বারে গা মুছিয়ে দিতে হবে।
  • অতিরিক্ত জ্বর হলে ঘন ঘন মাথায় পানি ঢালতে হবে।
  • জ্বর হলে রোগীকে অবশ্যই আলো-বাতাস সমৃদ্ধ জায়গায় রাখতে হবে। কোন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রাখা যাবে না।
  • অতিরিক্ত জ্বর হলে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগীকে প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ খেতে দিন।
  • অতিরিক্ত মাত্রায় জ্বর হলে শরীর পানি শূন্য হয়ে যায়। এজন্য এ সময় পানি ও পানি জাতীয় বিভিন্ন খাদ্য রোগীকে খাওয়াতে হবে। যেমন- গুড় বা চিনির শরবত, বিভিন্ন ফলের রস, আখের রস, ডাবের পানি, স্যালাইন ইত্যাদি রোগীকে বেশি বেশি খেতে দিন। 
  • এ সময় পর্যাপ্ত পরিমাণের পুষ্টিকর খাবার ও নরম খাবার দিতে হবে। যেমন- নরম খিচুড়ি, মারি ভাত, বিভিন্ন ধরনের ডাল, স্যুপ, মুরগি ও মাছের ঝোলের তরকারি ইত্যাদি খেতে দিতে হবে।
  • জ্বর হলে রোগীকে বাইরের খাবার খেতে দিবেন না। কারণ বাইরের খাবার হাইজেনিক নয়। বাইরের খাবারে অনেক ধরনের রোগ জীবাণু থাকতে পারে যা জ্বরকে আরো বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করবে।
  • এ সময় বেশি করে ভিটামিন সি জাতীয় ফল রোগীকে খেতে দিতে হবে। যেমন- আম, আনারস, পেয়ারা, কমলা, মাল্টা, আঙ্গুর, কামরাঙ্গা, আমড়া ইত্যাদি ফলমূলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি রয়েছে।
  • এ সময় রোগীকে চা, কফি বা অ্যালকোহল জাতীয় কোন খাদ্য দেওয়া যাবে না। এতে করে শরীরে পানিশূন্যতা হতে পারে। তবে গলা ব্যথা করলে অল্প পরিমাণে আদা চা খাওয়ানো যাবে।
  • ভাইরাসজনিত জ্বর হলে রোগীকে হালকা গরম পানি দিয়ে গোসল করানো যাবে।
  • এ সময় পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুম ও বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দিতে হবে।
  • জ্বর হলে রোগীকে অবশ্যই কোলাহলমুক্ত পরিবেশ দিতে হবে। রোগীর আশেপাশে কোন ধরনের কোলাহল থাকা যাবে না।

শিশুর ভাইরাস জ্বরের লক্ষণ

সাধারণত শিশুরাই ভাইরাসজনিত জ্বরে বেশি ভুগে থাকে। কারণ শিশুদের শরীরে সহজেই ভাইরাস আক্রমণ করার সুযোগ পায়। শিশুদের জ্বর হলে যে লক্ষণগুলো প্রতিফলিত হয় তা নিচে তুলে ধরা হলো।

  • জ্বরে আক্রান্ত শিশুর শরীর প্রচন্ড গরমে হবে। এ সময় জ্বর মাপলে সাধারণত জ্বর ১০২ ডিগ্রী থেকে ১০৪ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠতে পারে।
  • নাক-চোখ দিয়ে এ সময় শিশুর প্রচন্ড পরিমাণে পানি ঝরবে।
  • এ সময় শিশুর হাঁচি-কাশি সহজে থামবে চায় না। অনবরত হাঁচি-কাশি হতেই থাকে।
  • ভাইরাস জ্বর হলে শিশুর খাবারের প্রতি প্রচন্ড অনীহা তৈরি হয়।
  • এ সময় কোন কিছু খেতে গেলেই বমি হয়ে যায়।
  • প্রচন্ড জ্বর হলে শিশুর শরীর জোরে জোরে কাঁপতে থাকে এবং কাঁপুনি সহজে ভালো হতে চায় না।
  • কখনো কখনো অতিরিক্ত জোরে শিশুদের শরীরে খিঁচুনি হতে পারে এবং এর ফলে শিশুরা অজ্ঞান হয়ে যায়।
  • ভাইরাস জনিত জ্বর হলে প্যারাসিটামল খাওয়ানোর পর জ্বর একটু কমে আবার পুনরায় জ্বর চলে আসে।
  • ভাইরাস জ্বর হলে শিশুদের প্রচন্ড পেট ব্যথা ও ডায়রিয়া বা আমাশয় দেখা দিতে পারে।
  • এ জ্বর হলে শিশুদের শরীরে ও ত্বকে এলার্জি দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
  • ভাইরাস জ্বরের কারণে শিশুর মুখের ভিতরে ঘা হয়ে থাকে।

শিশুর ভাইরাস জ্বরে করণীয়

বড়দের জ্বর হলে যা করণীয় ঠিক তেমনটি শিশুদের জ্বর হলেও তাই করতে হবে। এরপরেও আপনাদের সুবিধার্থে শিশুর ভাইরাস জ্বরে করণীয় সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হলো।

  • আপনার শিশু জ্বর হলে কুসুম গরম পানিতে গামছা ভিজিয়ে গোটা শরীর মুছে দিতে হবে এবং ঘন ঘন কপালে পানিপট্টি দিতে হবে।
  • অতিরিক্ত জ্বর হলে মাথায় ঘন ঘন পানি ঢালতে হবে। এতে করে আপনার শিশু কিছুটা আরাম বোধ করবে।
  • জ্বর হলে আপনার শিশুকে আলো-বাতাস যুক্ত জায়গায় রাখুন।
  • জ্বর হলে আপনার শিশুকে পর্যাপ্ত পরিমাণে পুষ্টিকর খাবার খেতে দিন।
  • জ্বর হলে শরীরে পানি শূন্যতা দেখা দেয় এজন্য আপনার শিশুকে ঘন ঘন পানি ও পানি জাতীয় খাবার খেতে দিন।যেমন- গুড় বা চিনির শরবত, বিভিন্ন ফলের রস, আখের রস, ডাবের পানি, স্যালাইন ইত্যাদি।
  • এ সময় আপনার শিশুকে নরম খাবার খেতে দিন। যেমন- নরম খিচুড়ি, মারি ভাত, বিভিন্ন ধরনের ডাল, স্যুপ, মুরগি ও মাছের ঝোলের তরকারি ইত্যাদি খেতে দিতে হবে।
  • বুকের দুধ পান করে এমন শিশুর জ্বর হলে বেশি বেশি বুকের দুধ খাওয়ান। এতে করে আপনার শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
  • ভিটামিন সি বা টক জাতীয় ফল যেমন- বাতাবি লেবু, আমড়া, কমলা, লেবু, মাল্টা, আঙ্গুর ইত্যাদি খেতে দিতে হবে।

শেষ কথা

উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমরা সকলেই ভাইরাস জ্বরের লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে পারলাম। এ জ্বর খুবই মারাত্মক যা আপনার শিশুর ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের শারীরিকভাবে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। আপনার পরিবারে কারো যদি এ ধরনের জ্বর হয়ে থাকে তাহলে ঘরোয়া ট্রিটমেন্টের পাশাপাশি দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ অবশ্যই নিবেন।

পরিশেষে আমি এটাই বলব যে, আমার এই পোস্টটি পড়ে আপনাদের যদি ভালো লেগে থাকে তাহলে বেশি বেশি করে শেয়ার করে দিবেন এবং এ ধরনের আরো পোস্ট পেতে সাথেই থাকবেন। ধন্যবাদ সবাইকে।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

AN Heaven এর নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url