শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে করণীয় সম্পর্কে জেনে রাখুন

মোবাইল ফোনের উপকারিতা ও অপকারিতাশিশুর বিকাশ একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে করণীয় সম্পর্কে সকলের জানা প্রয়োজন। শিশুর বিকাশ যেন সঠিকভাবে হয় সেদিকে আমাদের সকলের লক্ষ্য রাখা উচিত। শিশু জন্মের পর থেকে তার জীবন বিকাশের স্তর গুলো বিকশিত হতে শুরু হয়। তাদের এই বিকাশে ক্ষেত্রে বেশ কিছু বাধা আসতে পারে। আমাদের উচিত সেই বাঁধাগুলোকে সরিয়ে ফেলে শিশুদেরকে সঠিক ভাবে বিকাশিত করা। আমি আমার এই পোস্টে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।

শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ

তাই আপনারা আপনাদের শিশুদেরকে শারীরিক ও মানসিক ভাবে বিকাশিত করার জন্য আমার এই পোস্টটি মনোযোগ সহকারে পড়ুন। আশা করি এই পোস্টটি পড়ে আপনারা অনেক কিছু জানতে ও শিখতে পাবেন।

পোস্ট সূচিপত্রঃশিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে করণীয় সম্পর্কে জেনে রাখুন

ভূমিকা

জন্মের পর থেকে শিশুর বিভিন্ন ধরনের বিকাশ সাধিত হয়ে থাকে। শিশু জন্মের পর থেকে তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশ যেন সঠিকভাবে হয় তা দেখা প্রত্যেক বাবা-মায়েরই একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। প্রত্যেক বাবা মায়ের উচিত শিশুর এ সকল বিকাশের দিকে লক্ষ্য রাখা। শিশুর সঠিক বিকাশ তাকে ভবিষ্যতে একজন সুদক্ষ ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে সাহায্য করবে। এজন্য সকলের উচিত শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে করণীয় কি সে সম্পর্কে ধারণা রাখা।

শিশুর বিকাশ কাকে বলে

শিশু তার শারীরিক, মানসিক, সামাজিক প্রভূতি দিক থেকে যে কাজগুলো সে করছে সেগুলো সঠিক ও সুন্দরভাবে সম্পূর্ন করাকে শিশুর বিকাশ বলে। অর্থাৎ, বিকাশ বলতে বোঝায় শিশুর আকার ও ক্রিয়ার দ্রুত পরিবর্তনকে। বিকাশ হল ক্রম-উন্নয়নশীল সকল প্রকার দৈহিকগত ও গুনগত পরিবর্তনের প্রক্রিয়া। এটি শিশুর জন্মের পর থেকে তার জীবনব্যাপী সকল দৈহিক ও গুনগত পরিবর্তনের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। শিশুর বিকাশে মৌলিক কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন-

  • শিশুর বিকাশ প্রক্রিয়া সহজাত ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সমন্বয়ের ফল।
  • শিশুর বিকাশ জীবনব্যাপী একটি প্রক্রিয়া।
  • বিকাশ হল শিশুর দৈহিক ও মানসিক বিকাশের হারের পরিবর্তন যা ক্রমাগত পরিবর্তন হতে থাকে।
  • বিকাশ বংশগত ও পারিপার্শ্বিক পারস্পারিক ক্রিয়ার ফল।
  • বিকাশ একটি গুণগত পরিবর্তন যা শিশুর মধ্যে প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়।
  • শিশুর বিকাশ হল একটি সাধারণ দিক থেকে একটি বিশেষ দিকে অগ্রসর হওয়া।
  • বিকাশ হল এক ধরনের অবিচ্ছিন্ন চলমান প্রক্রিয়া।

শিশুর বিকাশের ক্ষেত্র 

শিশুর বিকাশ হচ্ছে একটি প্রাকৃতিক ও সমষ্টিগত প্রক্রিয়া যা শিশুর জন্ম থেকে শুরু করে সারা জীবনব্যাপী একটি চলমান প্রক্রিয়া। শিশুর বিকাশের কোন নির্দিষ্ট পরিসীমা নেই। একটি শিশু জন্মের পর থেকে নানা দিক থেকে বিকাশিত হতে থাকে। এজন্য শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে করণীয় ও শিশুর বিকাশের ক্ষেত্র সম্পর্কে আমাদের জানতে হবে। সাধারণত শিশুর বিকাশের ক্ষেত্র ৫ ভাগে করা হয়ে থাকে। শিশুর বিকাশের  ক্ষেত্র গুলো হল।

শারীরিক বা দৈহিক বিকাশঃ শারীরিক বিকাশ বলতে সাধারণত বুঝায় শিশুর দৈহিক বা 
পরিবর্তনকে। শিশুর জন্মের পর শারীরিক পরিবর্তন সবার আগে সংগঠিত হয়। যেমন-ঘাড় সোজা করে রাখতে পারা, বুকের ওপর ভর দিয়ে সরতে পারা, বসে থাকতে পারা, হামাগুড়ি দিতে শেখা, হাঁটতে শেখা, দৌড়াতে পারা ইত্যাদি পর্যায়গুলো সঠিকভাবে সম্পূর্ণ করাকে শিশুর শারীরিক বা দৈহিক বিকাশ বলে।

মানসিক বিকাশঃ শিশুর বুদ্ধি, বোধ, জ্ঞান প্রভৃতি দিকগুলোর বহিঃপ্রকাশে হলো মানসিক বিকাশ। একটি শিশুর শারীরিক বিকাশের সাথে সাথে মানসিক বিকাশেরও বৃদ্ধি ঘটে। যা জন্মের পর থেকে শুরু করে বৃদ্ধকাল পর্যন্ত হয়ে থাকে। শিশুর মানসিক বিকাশ শিশুকে চিন্তা করতে, কল্পনা করতে, প্রত্যক্ষণ করতে, মনে রাখতে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করতে শিখায়। মানসিক বিকাশ ধীর গতিতে সংঘটিত হয়। এ বিকাশ চোখে দেখা যায় না, এটি অনুভব করতে হয়।

সামাজিক বিকাশঃ একটি শিশু যখন অন্য শিশুদের সাথে খেলতে, ঘুরে বেড়াতে, যোগাযোগ করতে এবং সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে শেখে তখনই তার মধ্যে সামাজিক বিকাশ প্রতিফলিত হয়। অর্থাৎ সমাজের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়াকেই সামাজিক বিকাশ বলে। শিশুদের সামাজিক বিকাশ গড়ে তোলার জন্য আমাদের কিছু পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।যেমন-

  • আপনার শিশুকে অন্য শিশুদের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে দিন।
  • শিশু এবং বয়স প্রাপ্তদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে দেওয়ার চেষ্টা করুন।
  • অন্য শিশুদের সাথে খেলাধুলা করার সুযোগ করে দিন।
  • আপনার শিশু যখন কোন কথা বলে সেটি মন দিয়ে শুনুন।
  • আপনার শিশুকে সঠিক ও ভুলের মধ্যে পার্থক্য শিখান।
  • অন্যদের চিন্তাভাবনা ও অনুভূতিগুলো মূল্যায়ন করতে শিখান।

কথা ও ভাষার বিকাশঃ শিশুর বিকাশে আরেকটি ক্ষেত্র হচ্ছে শিশুর কথা ও ভাষার বিকাশ। শিশু তার কথাগুলো সঠিক ভাষায় বলতে পারছে কিনা বা বুঝাতে পারছে কিনা সেটি আমাদেরকে অবশ্যই গুরুত্ব সহকারে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। শিশু যখন একটি বা দুইটি শব্দ বলা শুরু করে এবং তা যখন একটি বাক্যে পরিণত হয় তখন সেটিকে কথা ও ভাষার বিকাশ বলে। শিশু যত বড় হবে তার ভাষার বিকাশ তত বৃদ্ধি পাবে।

আরও পড়ুনঃ বাচ্চাদের সর্দি হলে কি খাওয়া উচিত

অনুভূতির বা আবেগের বিকাশঃ আবেগ বা অনুভূতি শিশুর বিকাশে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের সাথে সাথে আবেগে বা অনুভূতি বিকাশও প্রতিফলিত হতে থাকে। আবেগ একটি শিশুকে শক্তি যোগায়, কোন কাজ করতে উৎসাহিত করে, আচরণের ধরন ও প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করতে শেখায় ইত্যাদি। আবেগ-অনুভূতি ছাড়া কোন মানুষই সামনের দিকে এগোতে পারে না। প্রত্যেক মানুষেরই নিজস্ব আবেগ-অনুভূতি রয়েছে, যা সে বিভিন্ন কাজের মাধ্যমে প্রকাশ করে থাকে। রাগ করা, ভয় পাওয়া, হাসি-কান্না, লজ্জা পাওয়া ইত্যাদি শিশুর অনুভূতি বা আবেগের বিকাশ।

জীবন বিকাশের স্তর 

শিশুর বিকাশ বিভিন্ন পর্যায়ে বা স্তরে অতিক্রম করে থাকে। স্তর ভেদে শিশুর বিকাশ বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। জন্মের পর থেকে বৃদ্ধকাল পর্যন্ত বিকাশের বেশ কয়েকটি স্তর রয়েছে। সাধারণত শিশুর জীবন বিকাশের স্তর গুলোকে ৫ ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। যেমন-

ভূমিষ্ঠপূর্ব বিকাশঃ এই বিকাশ ০ থেকে ২৮০ দিন পর্যন্ত সময়কালকে বুঝায়। জন্মের পর থেকে ২৮০ দিন বয়স পর্যন্ত শিশুর যে মানসিক ও শারীরিক পরিবর্তন হয় তা ভূমিষ্ঠপূর্ব বিকাশ নামে পরিচিত। এর সময়কালে শিশুর নড়াচড়া করতে শেখে, বসতে শিখে, হু-হা করতে শেখ, ধরে ধরে দাঁড়াতে শেখ, হাটতে শিখে।

শৈশবকাল বিকাশঃ সাধারণত ২৮০ দিনের পর থেকে ৫ বছর পর্যন্ত সময়কে শৈশবকাল বলা হয়ে থাকে। এ সময় কালের মধ্যে যে বিকাশ সংঘটিত হয় তাকে শৈশব কালের বিকাশ বলে। এ সময়ে শিশুর মনের ভাব প্রকাশ করতে শেখা, খেলতে শেখা, গল্প করতে শেখা, ঘুরে বেড়াতে শেখা, জেদ করতে শেখা,অন্যের সাথে মিশতে শিখা ইত্যাদি এ সময় বেশি বিকাশিত হতে থাকে। শৈশবকাল শিশুর জন্য শারীরিক ও মানসিক বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর। এই স্তরে যদি শিশু প্রতিনিয়ত বাধাগ্রস্ত হয় তাহলে সে সঠিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে না। তাই আমাদের উচিত এই সময়টায় শিশু দিকে বেশি করে নজর দেওয়া।

বাল্যকাল বিকাশঃ ৫ বছর থেকে ১২ বছর পর্যন্ত সময় কালকে বাল্যকাল সময় বলে। কৈশোর সময় পার করার পর শিশুরা বাল্যকালে পা দেয়। এই সময়কালে শিশুদের মধ্যে যে পরিবর্তনগুলো লক্ষ্য করা যায়, তা বাল্যকালের বিকাশ হিসাবে গণ্য করা হয়। এ সময়ে একটি শিশু নতুন পরিবেশে পদার্পণ করে অর্থাৎ তার স্কুল জীবন শুরু করে। যে শিশু শৈশব কাল ভালোভাবে পার করতে পারবে সে শিশু বাল্যকালে এসে সুন্দর জীবন অতিবাহিত করতে পারবে। এ সময়কালে একটি শিশুর শিক্ষা জীবন শুরু হয়ে যায় এবং একটি নতুন জগতে প্রবেশ করে।

কৈশোরকাল বিকাশঃ ১২ বছরের পর থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত সময়কালকে কৈশোরকাল বলা হয়। এ সময় কালের মধ্যে যে বিকাশ সংঘটিত হয় তাকে কৈশোর কাল বিকাশ বলা হয়। এ সময়টা খুবই জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়ে প্রত্যেক বাবা-মায়ের উচিত তাদের সন্তানকে দেখে রাখা, সন্তানকে বোঝা, সময় দেওয়া, বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করা, সঠিক পথ দেখানো ইত্যাদি। আপনার সন্তান ভবিষ্যতে কেমন হবে ও কোন পথে যাবে তা এই সময়কাল নির্ধারণ করে দেয়। এ সময়ে আপনার সন্তান যদি ভালো কিছু শেখে তাহলে তার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে। আর যদি সে খারাপ কিছু শেখে তার ভবিষ্যৎ অনুজ্জ্বল হবে। তাই আমাদের উচিত কৈশোর কালে আমাদের সন্তানকে সময় দেওয়া এবং ভালো শিক্ষায় শিক্ষিত করা।

প্রাপ্তবয়স্ককাল বিকাশঃ ১৮ বছরের পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সময়কালকে প্রাপ্তবয়স্ক কাল বলে। এ সময়ে যে বিকাশ সংঘটিত হয় তাকে প্রাপ্তবয়স্ককাল বিকাশ বলা হয়ে থাকে। সাধারণত এ সময়কাল একজন মানুষের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের শেষ স্তর। এই স্তরের বিকাশে খুব একটা আমাদেরকে নজরে রাখতে হয় না। এ সময় একজন মানুষ সঠিক ও বেঠিক বিষয় সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত থাকে। এ সময় একজন মানুষ তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে এবং নিজের পছন্দ অনুযায়ী কাজকর্ম করতে পারে। এ সময় কালে বাবা-মাকে তার সন্তানকে তেমন একটা সময় দেওয়ার বা দেখাশোনার প্রয়োজন পড়ে না।

শারীরিক বিকাশ কাকে বলে

শারীরিক বিকাশ বলতে শিশুর দৈহিক পরিবর্তন ও আকারের বৃদ্ধিকে বোঝায়। মায়ের গর্ভ থেকেই শিশুর শারীরিক বিকাশ শুরু হয়ে যায়। জন্মের পর শিশুর শারীরিক পরিবর্তন আমরা নিজ চোঁখে প্রত্যক্ষ করতে পারি। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া যা প্রাকৃতিক নিয়মে চলতে থাকে। শিশু শারীরিক বিকাশের কিছু লক্ষণ বা বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয় যা দেখে আমরা বুঝতে পারবো আমাদের শিশুর শারীরিক বিকাশ সঠিকভাবে হচ্ছে। যেমন-

  • শিশু জন্মের পর নড়াচড়া দিয়ে তার শারীরিক বিকাশ শুরু করে।
  • এরপর শিশু একা একা বসতে শেখে। 
  • এর কিছুদিন পর হামাগুড়ি দিয়ে চলাফেরা করতে পারে।
  • এর কিছুদিন পর ধরে ধরে হাঁটতে শেখে।
  • ধরে ধরে হাঁটার পর পুরোপুরি হাঁটা শিখে যায়।
  • হাঁটা শিখার পর দৌড়াদৌড়ি করতে শিখে।

মানসিক বিকাশ বলতে কি বোঝয়

বিভিন্ন ধরনের মানসিক বৈশিষ্ট্যের বৃদ্ধি বা গ্রোথের একত্রিত সমন্বয়কে মানসিক বিকাশ বলে। নবজাত শিশুর মধ্যে যেসকল মানসিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, তা ধীরে ধীরে বিকাশিত হতে থাকে এবং ক্রমেই তা জটিল হতে থাকে। শিশুর স্মৃতিশক্তি, চিন্তাশক্তি, কল্পনাশক্তি, কথা বলা, সাড়া দেওয়া ইত্যাদি শিশুর মানসিক বিকাশ। শিশুর মানসিক বিকাশে কিছু বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। যেমন-

  • মানসিক বিকাশ জন্মের পর থেকে শুরু হয় এবং বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত এই ক্ষমতা ধীরে ধীরে হ্রাস পায়।
  • মানসিক বিকাশের ধরন বয়স ভেদে পরিবর্তন হয়।
  • দৈহিক বিকাশের সাথে সাথে মানসিক বিকাশও পরিবর্তন হতে থাকে।
  • মানসিক বিকাশ একটি জটিল প্রক্রিয়া যা শিশুর মনকে প্রভাবিত করতে পারে।

শিশুর মানসিক বিকাশে মায়ের ভূমিকা

শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে মায়ের ভূমিকা অপরীসিম। একটি শিশুর জীবনে বাবা-মা দুইজনেরই গুরুত্ব অনেক। তবে আমাদের সমাজে শিশু লালন-পালন করা, যত্ন করা, পড়ালেখা শিখানো, সকল খোজখবর রাখা প্রভৃতি বিষয়গুলো একজন মাকেই দেখতে হয়। আর একটি শিশু জন্মের পর তার মায়ের কাছাাছি থেকেই বড় হয়। একজন মা তার শিশুর সাথে যেরকম আচারণ করবে শিশুটির ঠিক সে রকমই মানসিক বিকাশে হবে। এজন্য প্রত্যেক মায়েদের উচিত শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে করণীয় কি সে সম্পর্কে অবগত থাকা।

শিশু জন্মের পর থেকে কৈশোরকার পর্যন্ত মায়ের তত্ত্বাবধানে থাকে। শিশুর বিকাশ সঠিকভাবে হচ্ছে কিনা তা একমাত্র একজন মা বুঝতে পারবে। এজন্য মাদের উচিত তার সন্তানকে সময় দেওয়া এবং তার সন্তানের জন্য কোনটি ভালো সে বিষয়ে সজাগ থাকা। একজন মা হচ্ছে একজন সন্তানের প্রথম শিক্ষক। একজন মা তার সন্তানকে যেভাবে বড় করবে, সে সন্তানটি ঠিক সেভাবেই মানুষ হবে। এজন্য সকল মাদের উচিত তাদের সন্তানকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করা।

শিশুর মানসিক বিকাশে বাবার ভূমিকা

শিশুর মানসিক বিকাশে বাবার ভূমিকা অনেক বেশি। শিশু সবসময় অনুকরণ প্রিয় হয়ে থাকে। অন্যকে অনুকরণ বা অনুসরণ করা শিশুর সহজাত প্রবৃত্তি। শিশুরা বেশিরভাগ সময় তাদের বাবাকে অনুসরণ করে থাকে। এজন্য বাবাদের উচিত শিশুর ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে ভাল আচার-আচারন বজায় রাখা। এতে করে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ সঠিক প্রক্রিয়ায় সংঘটিত হবে। সকল বাবারাই কাজের তাগিদে বাইরে বেশি সময় কাটায়।

শিশুদের সঠিকভাবে সময় দিতে পারে না এবং শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশে সাহায্য করতে তেমন একটা দেখা যায় না। মায়ের পাশাপাশি সকল বাবাদের উচিত তাদের শিশুদেরকে সময় দেওয়ার চেষ্টা করা। মায়ের পাশাপাশি বাবারাও যদি সন্তানদের সময় দেয় ও নৈতিক শিক্ষা দেয় তাহলে সে সন্তানের সঠিকভাবে শারীরিক ও মানসিক বিকাশ হবে। এজন্য প্রত্যেক বাবাদেরও উচিত শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে করণীয় সম্পর্কে অবগত থাকা।

শিশুর মানসিক বিকাশে পরিবারের ভূমিকা

সকল শিশুই প্রথম শিক্ষা তার পরিবারের কাছ থেকেই শিখে থাকে। শিশুর প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হল তার নিজ পরিবার। একটি শিশুর শারীরিক, মানসিক, সামাজিক প্রভৃতি বিকাশগুলো ঘটটে থাকে তার পরিবারের মধ্যেই। এজন্য সকল পরিবারের উচিত তার পরিবারের শিশুর যেন শারীরিক ও মানসিক বিকাশ কোনভাবে বাধাগ্রস্ত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা। একটি পরিবারের বাবা-মা ছাড়াও আরো অনেক সদস্য থাকতে পারে। একটি শিশুর মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে পরিবারের সকল সদস্যদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

পরিবারের সকল সদস্য যদি একত্রে মিলেমিশে বসবাস করে, তাহলে শিশুদের মনে তার ভালো প্রভাব পড়বে।আর যদি পরিবারে অমিল ও অশান্তি বিরাজ করে তাহলে শিশু মনে অনেক খারাপ প্রভাব পড়বে। যার ফলে শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে। তাই আমাদের সকলের উচিত শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে করণীয় কি সে সম্পর্কে সঠিকভাবে জানো।

শিশুর মানসিক বিকাশে বিদ্যালয়ের ভূমিকা

পরিবারের পরেই শিশুর মানসিক বিকাশে বিদ্যালয়ের ভূমিকা রয়েছে। শিশু শারীরিক ও মানসিক বিকাশে শিক্ষকের ভূমিকার বিকল্প নেয়। শিক্ষককে হতে হবে মেধাবী, সুশিক্ষি , সুদক্ষ, সুয্যেগ্য, কর্মঠ, ধার্মিক, সৎ ও মহৎ। এসকল গুণ যখন একজন শিক্ষকের মধ্যে থাকবে ঠিক তখনই শিশুরা বিদ্যালয়ে গিয়ে সে গুনগুলো অর্জন করবে। যার ফলে বিদ্যালয়ে যাওয়ার মাধ্যেমে শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশ সাধিত হবে।

এছাড়া বিদ্যালয়ে যাওয়ার শুরু করলে শিশুর জ্ঞান-বুদ্ধি, স্মৃতিশক্তি, দক্ষতা, বন্ধুত্ব করা, কথা বলা, খেলাধুলা করা ইত্যাদির মাধ্যমে শারীরিক ও মানসিক বিকাশ সাধিত হবে। এ বিকাশে স্কুলের যে ভূমিকা থাকে তা একটি শিশুকে তার পরবর্তী সময়কালকে প্রভাবিত করে। এজন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উচিত সকল শিশুদের সাথে সুসম্পর্ক বজায়।

শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে হুমকি 

শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশর হুমকি কোনটি সে বিষয়ে আমাদের ধারণা রাখতে হবে। আমাদের শিশুদেরকে সঠিক ভাবে বিকাশিত করতে হলে, যে সকল বিষয়গুলো তাদের জন্য হুমকি স্বরূপ সেগুলো থেকে শিশুদেরকে দূরে রাখতে হবে। যেমন-

  • বর্তমান সময়ে শিশুদের অতিরিক্ত মোবাইল, টিভি, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, ভিডিও গেম ইত্যাদি দেখার নেশা শিশুর জন্য শারীরিক ও মানসিক ভাবে ক্ষতিকর প্রভাব ফলছে এবং চোখের ও ব্রেনের নানা সমস্যার সৃষ্টি করছে।
  • এছাড়া পারিবারিক কলহল ও অশান্তি শিশুদের মনে খারাপ প্রভাব ফেলে। যার ফলে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ হুমকির মুখে পড়ে।
  • শিশুদের অপর্যাপ্ত ও অপুষ্টিকর খাদ্য ব্যবস্থার কারণে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।
  • শিশুর কাজে বাধা দান ও তাদের কথার মূল্য না দেওয়া হলে শিশুদের উপর খারাপ প্রভাব পড়ে। যার ফলে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।
  • অতিরিক্ত শাসন শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের হুমকি স্বরুপ।
  • বর্তমান সময়ে আমরা প্রায় সকলেই শিশুদের ঘরের মধ্যে বন্দী করে রাখি। বাইরের জগতে মিশতে বাধা দেই। এটি শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে অনেক বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
  • শিশুদের সাথে খারাপ আচরণ করা, বকাবকি করা, গালমন্দ করা ইত্যাদি ব্যবহার করলে শিশু শারীরিক মানসিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার

প্রত্যেক শিশুই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাই আমাদের সকলের উচিত শিশুর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে, তাদের বর্তমানকে সুন্দর ও বিকাশিত করে গড়ে তোলা। শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার যে বিষয়গুলো তা নিচে আলোচনা করা হলো।

  • শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য পারিবারিক সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।
  • শিশুদেরকে সব সময় পুষ্টিকর ও পর্যাপ্ত পরিমাণে খাদ্য গ্রহণের ব্যবস্থা করতে হবে।
  • শিশুদেরকে অতিরিক্ত শাসন না করে আদর করে বোঝাতে হবে।
  • শিশু বয়স থেকেই শিক্ষামূলক বইয়ের পাশাপাশি গল্পের বই পড়ার ইচ্ছা ও অভ্যস গড়ে তুলতে হবে।
  • গল্পের বই পড়ার মাধ্যমে শিশুর মানসিক বিকাশ ঘটে। যার ফলে শিশুরা জটিল শব্দ ও বাক্য সহজে বুঝতে পারে। এতে করে পড়া-শোনার আগ্রহ বৃদ্ধি পায়।
  • শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খেলা-ধুলার ব্যবস্থা করতে হবে।
  • শিশুদেরকে তাদের নিজেদের মতো করে কাজ করার স্বাধীনতা দিতে হবে।
  • শিশুদেরকে পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন অ্যাক্টিভিটিসে অংশগ্রহণ করতে দিতে হবে।
  • শিশুদেরকে অবশ্যই সকলের সাথে মিশতে দিতে বাধা দেওয়া যাবে না।
  • বাবা মাকে অবশ্যই শিশুদের প্রতি সময় দিতে হবে ও নজর রাখতে হবে।
  • আপনার শিশুকে অবশ্যই মোবাইল, কম্পিউটার, ভিডিও গেম, টেলিভিশন এগুলো বেশি দেখা থেকে বিরত রাখতে হবে।
  • আপনার শিশু সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলুন। যেন আপনার শিশু আপনার কাছে তার সকল বিষয়গুলো শেয়ার করতে পারে।

শেষ কথা

উপরের আলোচনা থেকে আমরা এটা জানতে পারলাম যে, শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে করণীয় পদক্ষেপ গুলো কি কি। যে সকল কারণগুলো শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশে বাধা দেয় সেগুলোকে বর্জন করতে হবে এবং যে পদক্ষেপ গুলো শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে সঠিকভাবে সংঘটিত করে সেগুলো গ্রহণ করতে হবে।

পরিশেষে আমি এটাই বলব যে, শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ নিয়ে আমার এই পোস্টটি যদি আপনাদের সকলের ভালো লেগে থাকে তাহলে অন্যদের সাথে শেয়ার করবেন এবং এ রকম আরো পোস্ট পেতে সাথেই থাকবেন। ধন্যবাদ।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

AN Heaven এর নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url